08/05/2026
ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে – “The road to hell is paved with good intentions”। ইতিহাসের কিছু ভয়ংকর ব্যর্থতা শুরু হয়েছিল একদম “ভালো উদ্দেশ্য” থেকে। বাংলাদেশে এখন নতুন সরকার। মনে হলো, যারা নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত আছে, এই গল্পগুলো তাদের শোনা দরকার।
১. COBRA বিপর্যয় (ব্রিটিশ ভারত)
গোখরা সাপের কামড়ে মানুষ মারা যাচ্ছিল, তাই সরকার ঘোষণা দিল- যে যত গোখরা মেরে আনবে, তাকে তত টাকা দেওয়া হবে। খুবই ভালো উদ্দেশ্য, কিন্তু হলো কী?
মানুষ গোখরা পালতে/ চাষ করতে শুরু করল টাকা কামানোর জন্য! পরে কাহিনী বুঝতে পেরে সরকার এই কার্যক্রম বন্ধ করে দিল। লোকজন পোষা সাপগুলো ছেড়ে দিল।
ফলাফল? - আগের চেয়ে আরও বেশি গোখরো সাপ!
২. চীনের চড়ুই পাখি হত্যার অভিযান
১৯৫০-এর দশকে মাও সেতুং এর চীন সরকার খেয়াল করল চড়ুই পাখি ফসলের শস্য খেয়ে ফেলছে। Four pests Campaign এর অংশ হিসেবে কোটি কোটি চড়ুই মেরে ফেলা হলো। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি- এই চড়ুই পাখিগুলো বিপুল পরিমাণ পোকামাকড়ও খেত।
চড়ুই কমে যাওয়ার পর পোকামাকড় ভয়ংকরভাবে বেড়ে যায় এবং ফসল ধ্বংস করতে শুরু করে।
ফলাফল? মানব ইতিহাসের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষগুলোর একটি, ১.৫ কোটি (মতান্তরে ৫.৫ কোটি) মানুষের মৃত্যু! এমন আরেকটা উদাহরণ আছে। ১৬৬৫-১৬৬৬ তে লন্ডনে প্লেগ ছড়িয়ে পড়লে কুকুর বিড়াল হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এখন আমরা জানি রোগ ছড়িয়েছিল মাছি (‘ফ্লি’) এর মাধ্যমে, আর তাদের বাহন ছিল ইঁদুর। কুকুর বিড়ালগুলো না মারলে তারা ইঁদুরের সংখ্যা কমাতে পারত।
৩. মেক্সিকো সিটির দূষণ কমানোর পরিকল্পনা
সরকার বলল- সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট গাড়ি চলতে পারবে না। যেমন: যেসব গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের শেষ অঙ্ক ৫, তারা রবিবার চলতে পারবে না। সরকার ভাবলো- এভাবে দূষণ কমানো যাবে।
গাড়ি চলাচলে অভ্যস্ত বহু মানুষের জন্য ব্যাপারটা খুবই অসুবিধার হয়ে গেল। তারা কী করল? আরেকটা পুরনো সস্তা গাড়ি কিনে ফেলল নিয়ম এড়ানোর জন্য!
ফলাফল? -> আরও বেশি গাড়ি, আরও বেশি দূষণ।
৪. নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভর্তুকি কেলেঙ্কারি
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে পরিবেশ রক্ষার জন্য সরকার হিটিং সিস্টেমে ভর্তুকি দিলো। শীতপ্রধান দেশ। মানুষ অভ্যস্ত ছিল ফায়ারপ্লেসে কাঠের টুকরো পুড়িয়ে ঘর গরম করতে। কিন্তু এতে দূষণ হতো। তাই সরকার বলল - কেউ যদি তার বাসা কাঠের টুকরোর বদলে নবায়নযোগ্য শক্তি দিয়ে গরম করে- তাকে ভর্তুকি দেওয়া হবে।
কী ঘটলো? সেই ভর্তুকি এত বেশি ছিল যে মানুষ এরপর খালি বিল্ডিংও গরম করতে লাগলো- শুধু টাকা পাওয়ার জন্য!
ফলাফল? ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়!
৫. এয়ারব্যাগ যখন বিপজ্জনক
মানুষকে বাঁচানোর জন্য গাড়িতে এয়ারব্যাগের প্রচলন হলো ১৯৯০ এর দিকে। এরপর দুর্ঘটনায় প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমলো। কিন্তু দেখা গেল- গাড়ি দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর হার বেড়ে গেছে! আসলে সামনের প্যাসেঞ্জার সিটের এয়ারব্যাগ এত জোরে খুলত সেই সিটে বসা শিশুরা এয়ারব্যাগের আঘাতে মারা যেত। আপনাদেরকে (নিজেকেও) সতর্ক করে রাখি- ১৩ বছরের নিচের শিশুদেরকে সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে পারতপক্ষে বসাবেন না।
এমন আরও কিছু গল্প অল্প করে বলি।
সোশ্যাল মিডিয়া চেয়েছিল মানুষকে “সংযুক্ত” করতে কিন্তু অ্যালগরিদম বুঝে গেল— রাগ, ভয়, বিতর্ক আর উত্তেজনামূলক পোস্ট মানুষকে বেশি সময় ধরে আটকে রাখে। তাই বেড়ে গেল ভুয়া খবর, বিভক্তি, অনলাইন আসক্তি, বিষাক্ত বিতর্ক।
দুর্ভিক্ষে মানুষকে বাঁচানোর জন্য খাদ্য সহায়তা পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু কিছু জায়গায় সশস্ত্র গোষ্ঠী সেই খাদ্য দখল করে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে।
আমেরিকায় একসময় ঢালাওভাবে মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল অপরাধ, আসক্তি আর পারিবারিক সহিংসতা কমানোর জন্য। কিন্তু অবৈধ মদের ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠল, মাফিয়ারা শক্তিশালী হয়ে গেল, আর নকল বিষাক্ত মদ খেয়ে মানুষ মরতে শুরু করল।
শহর “আধুনিক” করার জন্য পুরোনো এলাকাগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু এর ফলে হাজার হাজার পরিবার উচ্ছেদ হয়, বহু কমিউনিটি চিরতরে ভেঙে যায়।
এমন উদাহরণ আছে আরও অনেক।
:: এই সব গল্পের শিক্ষাটা একটাই: “ভালো উদ্দেশ্য” মানেই “ভালো ফলাফল” না।
পৃথিবী অনেক জটিল।
মানুষ নিয়মের সাথে মানিয়ে নেয়।
সিস্টেম পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়।
আর অনেক সময় “সমাধান” নিজেই নতুন সমস্যা তৈরি করে। তাই শুধু ভালো মন থাকাই যথেষ্ট না। ভবিষ্যৎ পরিণতি বোঝার দূরদর্শিতা থাকাও দরকার!© #চকমহাসান