21/09/2025
নিজের ছেলে বাচ্চাকে মানুষ হিসেবে বড় করে তুলুন,ছেলে মানুষ হিসেবে না।
সুফলটা আজ থেকে ২০/২৫ বছর পরে আপনিই পাবেন.......😊
১.রুমানার ঘুম ভাঙল ঠিক ৫টা ৫৯ এ। আর এক মিনিট পর এলার্ম দেয়া ছিল ঘড়িতে। আজব কান্ড!! এলার্ম টা তাড়াতাড়ি বন্ধ করল রুমানা। নইলে আবার ছেলের ঘুম ভেঙে যাবে।সাজ্জাদ কে হালকা করে কপালে হাত বুলিয়ে ডাকলো সে। খুব বিরক্তির সাথে চোখ খুলল সাজ্জাদ।
"কি সমস্যা? রোজ সকালে বিরক্ত কর কেন?"
"আমি উঠলাম, বাবুর দিকে খেয়াল রেখো আবার খাট থেকে পড়ে না যায়"
সাজ্জাদ বিড়বিড় করতে করতে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
রুমানা খুব দ্রুত কিছু কাজ সেরে ফেলল। রুটি বানালো, একটা সবজি করল,দুপুরের তরকারি রাঁধল, সেগুলো ঠান্ডা করে বাটিতে ভরে ফ্রিজে রাখল, বাবুর জন্য খিচুড়ি রেডি করে গোসলে ঢুকল যখন, তখন বাজে আটটা। শাওয়ার থেকেই শুনতে পাচ্ছে বাবু উঠে কান্না করছে। সাজ্জাদ খুব চেচাচ্ছে,
"একবার গোসলে ঢুকলেই হল, ছেলে যে ঘুম থেকে উঠে ডায়াপার নষ্ট করে বসে আছে সে খেয়াল নাই"
বাথরুম থেকেই উত্তর দিল রুমানা,
"সমস্যা নেই,ডায়াপার পড়ানো আছে কিচ্ছু হবেনা, আমি বেরুচ্ছি"
শাওয়ার থেকে আধামোছা বের হয়েই বাবুকে চেঞ্জ করে খাওয়ানোর চেষ্টা শুরু করল রুমানা। আজো অফিস পৌছুতে লেইট হবে নির্ঘাত। তবু এই মুহূর্তে বাবুকে খাওয়ানোটাই জরুরী। সারাদিন দাদীর কাছে কিচ্ছু খাবেনা সে। যা খাওয়ানোর রুমানাকেই খাওয়াতে হবে। গত এক বছর আপ্রাণ চেষ্টা করে কিছু টেকনিক বের করেছে সে।তবুও ঘন্টা খানিক লেগেই যায়।
সাজ্জাদ অফিসের জন্য রেডি হয়ে বসে আছে। রুমানা ছেলেকে ফিডিং চেয়ারে বসিয়ে রেখে রেখে সাজ্জাদের জন্য নাস্তা আনছে। সাজ্জাদের খাওয়া শেষে রুমানা বলল,
" এই একটু তোমার প্লেট টা ধুয়ে রেখো,আজ বুয়া আসবে না"
এমন সময় বাবুর দাদী ঘুম থেকে উঠে এলো।
"ওরে বাবারে, এগুলা কি যুগ আইলো, থাক থাক ওই একটা প্লেট আমিই ধুয়ে রাখবো। আমি তো এখনো মরি নাই যে আমার ছেলের প্লেট ধুইয়া খাইতে হইবো"
সাথে সাথে সাজ্জাদ ও হালকা ফোড়ন কাটলো,
" বুঝছো এই হইলো মা আর বউ এর পার্থক্য, অফিসে যাইতেছি,এই সময়ে হাবিজাবি কথা বার্তা"
ছেলেকে খাইয়ে নাকে মুখে দু নলা চাপিয়ে অফিসে চলে আসল রুমানা। পারফেকশনিস্ট হিসেবে প্রচুর সুনাম তার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা মেধাবী আর ক্যারিয়ারের প্রতি এমন ডেডিকেটেড এই কোম্পানিতে কম ই আছে। জয়েনিং এর দু বছরের মাথায় দুইটা প্রমোশন পেয়ে তাক লাগিয়ে দিল সে। তার সাথে জয়েন করেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি রাশেদ। বাচ্চা হবার পর মাঝে মাঝে একটু দেরী করে আসা এর বাইরে কাজের কোন কমতি করেনি রুমানা। তবুও আজ রুমানাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বাকি কলিগদের সাথে গল্প করছিল রাশেদ,
"আসলে মেয়ে মানুষ মেয়ে মানুষ ই, এদের দিয়া ওই বাচ্চা পালাই যায়, আর কিছুনা। আর বাচ্চা হইলো এদের সবচেয়ে বড় বাহানা। কিছু হইলেই বাচ্চার জ্বর, বাচ্চার আমাশা, বাচ্চার কষা পায়খানা"
বেশ কৌতুককর পরিস্থিতি। রুমানা মনে করার চেষ্টা করল কখনও কি বাচ্চাকে জড়িয়ে কিছু বলেছে কিনা? মনে পড়ল না তার। কাজে মনোনিবেশ করল সে। বিকেল পাঁচটায় ঘরে ফিরতেই দেখে হুলস্থুল কান্ড। বাসা ভর্তি মেহমান। শ্বাশুড়ি দাওয়াত করেছে অথচ কিছুই জানায়নি তাকে। নিজের এলোমেলো বেডরুম গুছিয়ে ছেলেকে খাওয়াতে বসাতেই সাজ্জাদের আগমন,
"কি কর"
"দেখতেই পাচ্ছ বাবুকে খাওয়াচ্ছি"
"আম্মা একা একা মেহমান সামলাচ্ছে, তোমার কি একটু কার্টেসিও নাই?"
"যাব সাজ্জাদ, বাবু সারাদিন তেমন কিছু খায় নাই, আমি আসতেছি,তাছাড়া সবার সাথে কথা হইছে"
সাজ্জাদ বিদ্রুপের হাসি দিল। এই হাসির অর্থ রুমানা আসলেই জানেনা। বাবুকে খাইয়ে রান্না ঘরে ঢুকতেই শ্বাশুড়ির কালো মুখ। একসময় এই সব মুখের অর্থ জানতে খুব ইচ্ছা হত রুমানার। আজকাল আর হয় না। পোলাও, রোস্ট, খাশির রেজালা, পায়েস শেষ করে মেহমান বিদায় করে থালা বাসন মাজতে মাজতে রুমানার পায়ে ব্যথা শুরু হল।ইদানীং এই সমস্যা হয়েছে দাঁড়িয়ে কাজ করলেই ব্যথা।
সাজ্জাদেত মেজাজ আজকাল অযথাই খারাপ থাকে, শুধু শুধু চিল্লাচ্ছে,
" এমন মা আমি জীবনে দেখি নাই, নিজেরে ছেলে ময়লা হাতাচ্ছে জামা নষ্ট করতেছে, কোন হুশ নাই"
"তুমি একটু জামা চেঞ্জ করে ঘুম পাড়িয়ে দাও"
" আমি??"
আর উত্তর করল না রুমানা। ছেলেকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে পায়ের ব্যাথাটা আরো বাড়ল।মনে হচ্ছে কেউ যদি একটু মালিশ করে দিত। রুমানা শুয়ে শুয়ে হিসেব কষছে তিন বছরের প্রেমিক এবং ৪ বছর বিবাহিত জীবনের সংগীকে এই প্রস্তাবটা দেয়া যায় কিনা। উত্তরটা মনে মনে জানাই ছিল তবু প্রশ্ন টা করে বসল,
"এই একটু পা টা মালিশ করে দেবে,খুব ব্যাথা করছে"
"রুমানা রাত বাজে দেড়টা,সারাদিন অফিস করে ঘুমাতে আসছি, শুয়ে থাকো একাই ঠিক হয়ে যাবে"
রাত বাড়তে থাকল, রুমানার আজ আর ঘুম হলোনা।পায়ের ব্যাথাটা অন্তরে গিয়ে ঠেকলো। সেখানে অভিমান নেই,রাগ নেই, দু:খ নেই। কিন্তু কি যেন তীব্র এক অনুভূতি আছে। ছেলেকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে চেপে ধরে রাখলো সারারাত।
পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে শপিং মলে ঢুকে বাচ্চাদের খেলনার জোনে গিয়ে একটা খেলনা হাড়ি পাতিলের সেট আর একটা ঘর পরিষ্কারের সেট চাইল সে।
দোকানদার জিজ্ঞেস করল,
"আপা আপনার মেয়ের বয়স কত?"
"মেয়ে না আমার সন্তান শুধুই আমার সন্তান। তবে হ্যা শারিরীক গঠন অনুযায়ী সে একটা ছেলে, বয়স ১ বছর"
দোকানদার অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
২. পঁচিশ বছর পর।
আগামী দুই দিন রুমানার ছুটি। ছোট একটা ব্যাগ গুছিয়ে ছেলের বাসায় যাচ্ছে সে। সাজ্জাদ অফিসের কাজে দেশের বাইরে।ছেলের বাসা খুব কাছেই। তবুও রিকশা নিয়ে নিলো রুমানা। আজকাল হাঁটতে ইচ্ছা করেনা।
অনীক বাসাতেই ছিল। মা কে দেখে খুশিতে একটা লাফ দিলো।
রুমানা, " কিরে আজকে তিতলীর ডিউটি কখন?"
" মা, আজ ওর ইভিনিং ডিউটি, আসতে আসতে রাত নয়টা বাজবে"
রুমানা রুমে গিয়ে কাপড় বদলে আসতেই অনীক চা নিয়ে হাজির,
" মা তোমার স্পেশাল চা"
রুমানা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে,
"বাহ, চমৎকার, ধন্যবাদ বাবা"
কি একটা মনে করে জিভ কাটলো অনীক।
"মা একটু বসো তো, তিতলী তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়েছে, ওর দুটো জামা ভিজিয়েছিল, ধুয়ে যেতে পারেনি, দশ মিনিটের মধ্যে আসছি মা, দেরী হলে কাপড়ে দূর্গন্ধ হবে তাইনা মা?"
রুমানা হাসতে হাসতে,
"হুম দৌড় দে, আমি কিন্তু এখনি গন্ধ পাচ্ছি"
অনীক মায়ের জন্য মায়ের পছন্দের রান্না শেষ করে রাস্তায় গেলো তিতলীকে আনতে।
তিতলী বাইক টা ঢুকাতে ঢুকাতে অনীককে বললো,
"রোজ রাতে কেন আসতে হবে আমাকে নিতে,পুলিশের চাকরী করি, কত দাগী আসামী ধরে বেড়াই, দরকার হলে বইলো তোমাকে পিক করব অফিস থেকে "
অনীক কিছু বললো না। বাসার আশেপাশেই তিতলী আছে কিন্তু সে কাছে নেই, মনে হয় যেন অনেকখানি সময় একসাথে কাটানো মিস করা।
তিতলী ঘরে ফিরতেই রুমানা বললো,
"শিগগির ফ্রেশ হয়ে এসো, আজ আমার প্রিয় প্রিয় আইটেম, আমি কিন্তু আর বসে থাকতে পারছিনা।"
রুমানা লক্ষ্য করলো তিতলী খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।
"কি হয়েছে মা তোমার পায়ে?"
"আর বলবেন না, আজ তাড়াহুড়ো করে ব্রেক কষতে গিয়ে বেকায়দায় পা পড়ে গিয়েছিল"
অনীক হাস্যরস করলো,
" নিশ্চয়ই সুন্দর ক্রিমিনাল দেখে মাথা ঘুরে গেছিল তোমার, আমার সাথে টাল্টিবাজি করতে চাইছো আর ডিরেক্ট ইফেক্ট আল্লাহ দেখিয়ে দিয়েছে। "
খাওয়া শেষে তিতলী টেবিল গুছাতে গুছাতে প্লেট ধুয়ে ফেললো অনীক।
কিছুক্ষন গল্প করে শুতে চলে গেল রুমানা। রুমে গিয়েই মনে হলো পানি খেতে ইচ্ছে করছে। ডাইনিং স্পেসে আসতেই চোখে পড়লো ড্রয়িং রুমে টিভি দেখছে অনীক আর তিতলী। তিতলীর ব্যাথা পাওয়া পা টা পরম ভালোবাসায় ম্যাসাজ করে দিচ্ছে অনীক।
মুহূর্তেই পঁচিশ বছর পুরনো পায়ের ব্যাথার কথা মনে পড়ল রুমানার। মনে পড়ল পঁচিশ বছর ধরে সমাজের বিপরীতে একটি শিশুকে বড় করে তোলার গল্প। খেলনা হাড়ি পাতিলের গল্প।ছেলের হাতে ঝাড়ু,খুন্তি, ডিটারজেন্ট, হারপিক তুলে দেয়ার গল্প। উপহাসের গল্প। সংসারের কাজ মানে সংসারের কাজ, কাজ করে স্ত্রীর কাজে হেল্প করা নয় বরং নিজেকেই হেল্প করা এই মানসিকতা তৈরীর গল্প।
তিতলীর চোখে ঘুম চলে আসছে। আর তার সাথে সাথে রুমানার পঁচিশ বছরের পুরনো পায়ের ব্যাথাটাও আজ আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে।
*****HOW TO RAISE YOUR KID, NOT SON, JUST KID