01/08/2025
মর্গে রাখা এক মানিকধন কে নিয়ে আবদুল্লাহ
লিখেছেন। সারা পৃথিবীর মধ্যে এমন কষ্ট শুধু বাংলার মাটিতেই সবচেয়ে বেশী ঘটে।😭
আমার কলিজার টুকরো স্কুল শেষ করে বাসায় ফিরবে। প্রতিদিন তার বাবাই স্কুলে দিয়ে যায় এবং ছুটির পর স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে আসে। ৪ সদস্যের সুখের ফ্যামিলি, আমার শ্বশুর, স্বামী আর আমার কলিজার টুকরো মানিকধন কাব্য আহসান। মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে ক্লাস ফাইভে পড়ে সে। প্রতিদিনকার মতো আজও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলাম। অন্যান্য দিন থেকে আজকের দিনটি কেমন জানি বেশি সুন্দর লাগছিলো। মৃদু বাতাস, কোলাহল মুক্ত পরিবেশ,মনে হচ্ছে আজকে স্পেশাল কোন দিন। কাব্যেকে নিয়ে ছাদে গেলাম, কবুতরকে নিজ হাতে খাবার ছিটানো তার ভালো লাগা গুলোর মধ্যে একটি। এরই মাঝে বেশ কিছুক্ষণ রাইটিং ফ্যাক্টিস করল সে। শেষমেশ নাস্তা করে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্য তার বাবার সাথে বের হয়ে গেলো। কি যে উৎফুল্ল আমার ছেলেটা," মাম্মাহ আসি" বলে পাপ্পাহ দিয়ে জড়িয়ে ধরল, আমিও হাসিখুশি ভাবে বিদায় দিলাম। তার বাবা তার দাদু বেশ যত্নবান কাব্যের প্রতি, বেশ কয়েকটি পান্তুয়া পিঠা টিফিন বক্সে দিয়ে দিলাম। পান্তুয়া পিঠা সে ভীষণ রকম পছন্দ করে। যতক্ষণ কাব্য স্কুলে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মনটা চটপট করে,চিন্তিত থাকে মন, কতশত দোয়া দরুদ করি, খোদার কাছে আমানত দিয়ে রাখি যাতে আমার কলিজার টুকরো কাব্য আমার কোলে সহীহ্ ছালামতে ফিরে আসে। অন্যান্য দিন থেকে আজ কেনো জানি কাব্যের কথা বেশি বেশি মনে পড়তেছে। আমি কাব্যের বাবাকে কল দিলাম,তিনি আমায় বললো এতো দুশ্চিন্তা করিও না স্কুল ছুটি হলে আমি তাকে নিয়ে আসবো।🥹
আমি দুপুরের খাবার রেডি করে রেখেছি আমার কাব্যর সাথে এক টেবিলে বসে খাবো। ইলিশ ও পুঁইশাকের ঝোল আমার বাচ্চাটার ভীষণ রকম পছন্দের, তার কথা ভেবে আমরা তেমন একটা ঝাল খাইনা। স্কুল ছুটির আর বেশি সময় নাই, এই মিনিট দশেকের মতো বাকি আর, কাব্যের বাবার সাথে কথা হলো উনি কাব্যকে আনতে ইতিমধ্যেই রওনা দিয়েছেন পথে আছে।
হঠাৎ আমার শ্বশুর টিভির সামনে থেকে আমায় ডাকতেছে উৎকন্ঠিত গলায়। আমি কাছে আসতেই বললো আমার দাদুভাই কোথায়! আমি টিভির স্কিনে চোখ রেখে হতবিহ্বল হয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে স্ট্যাচু হয়ে গেলাম তারপর কলিজা ফাটা চিৎকার করে উঠলাম আমার কাব্যরে..রে... কিছু না ভেবেই স্কুলের উদ্দেশ্য বের হয়ে গেলাম।
ছোট বেলায় একবার আগুনে তার হাত পুড়ে যায় দুষ্টামি করতে গিয়ে। আগুনে পোড়া দাগটি এখনো তার বাম হাতের কব্জির উপরে আছে। তখন থেকেই কাব্য আগুনকে ভীষণ রকমের ভয় পায়। পানিকে আগে ভয় পেতো কিন্তু এখন আর পায় না কারণ তার দাদু তাকে সাঁতার কিভাবে কাটতে হয় তা শিখিয়েছেন গ্রামের বাড়ির পুকুর থেকে।
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু পথ যেন শেষই হচ্ছে না, আজ মনে হচ্ছে কাব্যের স্কুলটি পৃথিবীর অন্যে কোন প্রান্তে অবস্থিত। ফোন বেজেই যাচ্ছে কিন্তু আমার সেইদিকে কোন খেয়াল নেই, কারণ আমার কলিজা পুড়েই যাচ্ছে কাব্যেকে জড়িয়ে ধরার জন্যে। স্কুলে পৌঁছে আমার কাব্য, আমার মানিকধন,আমার কলিজার টুকরো কোথায় রে আমার............! ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও কেনো জানি নানা কথা আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে, সাথে নয়নের কোনায় নোনাজল ভিড় করেছে। স্কুল ভবনের নিচতলায় আগুনের কুন্ডুলি, ধোঁয়ার চেয়ে গেছে চারপাশ। আমার মতো অনেকেই আসছে তাদের বাচ্চাদের খোঁজে। অনেক মানুষ, হৈচৈ, আহাজারি দীর্ঘশ্বাস, একের পর এক বাচ্চাকে উদ্ধার করে আনতেছে। কারো অর্ধেক পুড়ে যাওয়া,কারো সম্পূর্ণ, কেউ সম্পূর্ণ পুড়ে কাবাব হয়ে গেছে। কাব্যের বাবা আমাদের কাব্য কোথায়? পেয়েছো তাকে? কাব্যের বাবা আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে। হঠাৎ করে পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসলো, আমি জ্ঞান হারালাম!
মিনিট পাঁচ পরে একজন উদ্ধার কর্মী পুড়ে যাওয়া একটা বাচ্চাকে কোলে করে নিয়ে আসতেছে ক্লাস রুমের ভিতর থেকে। বাচ্চাটার ইউনিফর্ম,চুল, হাত_পা অর্থাৎ আপদমস্তক আগুনে জ্বলছে গেছে। মুখ দেখে আইডেন্টিফাই করা জো নাই....এম্বুলেন্সে উঠানো হলো বাচ্চাটিকে। সবাই ভীড় জমিয়েছে এম্বুলেন্সের কাছে, একটা বাচ্চা উদ্ধার করে আনে তো সবাই ভীড় জমায় তাদের নিজ নিজ বাচ্চার খোঁজে। তাড়াহুড়ো করে আমি আর কাব্যের বাবা এম্বুলেন্সের দিকে এগিয়ে গেলাম। কাব্যের বাবা, "এইতো আমাদের কাব্যে।ওরে কাব্যে রে.... আল্লাহ আমার সাথে এমন করলা কেন রে...বলে আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। এরই ফাঁকে উদ্ধার কর্মী বললো শেষ বাচ্চাটার কাঁধে একটা ব্যাগ ছিলো এই হলো সেই ব্যাগ বলে ব্যাগটি এম্বুলেন্সের পিছনে মাটিতে রাখল। কাব্যের বাবা এবার সিউর হলো যে এটাই আমাদের কাব্য, আমি বার বার হুশ হারাচ্ছি,জড়িয়ে ধরতে গেলাম কিন্তু কেউ আমার মানিকধন কে একটু খানি জড়িয়ে ধরতেও দিলো না। আমার কলিজায় শূন্যতা অনুভবের মাঝেই আমি জ্ঞান হারালাম।
জ্ঞান ফিরে দেখি আমি হাসপাতালে, আমার মানিকধন কোথায়? হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখি কাব্যের পাশে তার বাবা বসে আছে আর চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তেছে। কাব্যের রক্তের গ্রুপ এ নেগেটিভ, ডাক্তার যখন বললো রক্ত লাগবে তখন কাব্যের বাবাই রক্ত দিলো কারণ কাব্যের বাবারও রক্তের গ্রুপ এ নেগেটিভ। রক্তের জন্যে হাহাকার, অনেকেই রক্ত পাচ্ছিলো না বাচ্চাদের দেওয়ার জন্যে, নেগেটিভ রক্তের সংকট দেখা দিলো হাসপাতালে।কাব্যের পুরো বডি তে বেন্ডিজ,চোখ বুজে আছে,অক্সিজেন দেওয়া নাকে_মুখে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলাম, দেখতেছি সবাই কান্নাকাটি করতেছে,এরই মাঝে খবর পেয়ে কাব্যের গ্রামের আত্মীয়স্বজন সবাই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। কিছুক্ষণের ভিতর কয়েকজন নার্স এসে কাব্যেকে কোথায় জানি নিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম কোথায় নেন আমার কাব্যকে? ,আমি কোথায় নিতে দিবো না,মেরে ফেলবেননা তো! কোথায়ও নেওয়ার দরকার নাই, আমার কাব্যের কিছুই হয় নাই! সে ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তার সাহেব আমার কাব্যেকে ঠিক করে দেন আমি তাকে বাসায় নিয়ে যাবো। নার্সরা কিছু না বলেই, কাব্যকে উপর তলায় আইসিউ রুমে নিয়ে গেলো। আমি অসহায় দৃষ্টিতে কাব্যের দিকে তাকিয়ে ছিলাম তখন,একদম বোবা হয়ে, পাথর হয়ে গেলাম।
আমি কাব্যের বারো আনা পুড়ে যাওয়া ব্যাগটা খুললাম, বই খাতাগুলো অর্ধেক অর্ধেক পুড়ে গেছে_ব্যাগের ভিতর টিফিন বক্সে এখনো ১টি পিঠা অবশিষ্ট আছে। 😔
আইসিউতে ঢুকতে দিলো... একদম সুনসান নিরবতা সবদিকে,শুধু একটা মেসিনের টিপ_টপ শব্দ কানে ভেসে আসতেছে। আমার মানিকধন ঘুমাচ্ছে,.. অনেকগুলো পাইপ তার মুখে নাকে,বুকে! কতশত কথা মনে ভাসতেছে, বিয়ের ৬বছর পর কত ডাক্তার,কবিরাজ, মুন্সি এবং আল্লাহর দয়াতে আমরা তাকে পেয়েছি। আমাদের বাচ্চা হচ্ছিলো না, অনেক সাধনার পর আমরা তাকে পেয়েছি। তার বাবা তাকে পেয়ে যেন সাত রাজার ধন পেয়েছে। সেই আমার কলিজার টুকরো কে চুপিসারে কতশতবার ডাকতেছি কিন্তু কোন সাড়াশব্দ নাই। আমি অনেক কাকুতি মিনতি করছি আমার কাব্যের পাশে সারারাত বসে থাকার জন্যে। কিন্তু অনুমতি দিলো না..... একসময় অধিক কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। চোখ জলশূন্য.....
এম্বুলেন্সের শব্দ বেজেই চলছে কদমতলী গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে একটা নির্মল ফুলকে দাফন করতে হবে। আজ কাব্যে পেল একেবারে ছুটি __যেখানে নেই আর সকাল, নেই স্কুল, নেই মা’য়ের কোলে ফিরে আসা।🥹
C.p