08/04/2025
“যদি আমরা ঘুমের মধ্যে মরে যাই… তখনও কি ব্যথা লাগবে?”
গত সপ্তাহের এক রাত। বাইরে চলছে গো*লাগুলি, বি*স্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠছে চারপাশ।
আমার চার বছর বয়সী ছোট ভাগ্নি হঠাৎ একটি প্রশ্ন করল—যা আমার হৃদয়ে চিরকালের জন্য গেঁথে থাকবে।
“যদি আমরা ঘুমের মধ্যে মরে যাই… তখনও কি ব্যথা লাগবে?”
আমি এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে যাই। কী উত্তর দেব? কীভাবে বলি তাকে—যে শিশুকালেই মৃত্যুর চেয়ে বেশি কিছু দেখেনি—যে ঘুমিয়ে শান্তিতে চলে যাওয়া এক রকম করুণা?
আমি শুধু বলি, “না। আমি মনে করি না। তাই আমাদের এখন ঘুমিয়ে পড়া উচিত।”
সে চোখ বন্ধ করে দেয়। দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ে।
আমার বিশ্বাস, সে সত্যিই বিশ্বাস করেছিল আমাকে।
আমি সেই অন্ধকার ঘরে বসে থাকি। বাইরে বো*মার শব্দ। মনে পড়ে, এই কয়েক রাস্তা দূরেই হয়তো ঠিক এই মুহূর্তে, কোনো শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবন্ত কবর হচ্ছে।
আমার ১২ জন ভাগ্নে ও ভাগ্নি আছে—সবাই নয় বছরের নিচে। তাদের হাসি আর উপস্থিতিই ছিল এই অন্ধকার সময়ে আমার শান্তি, আমার আশ্রয়।
কিন্তু তাদের চোখের প্রশ্ন, মুখের আতঙ্ক, আমাদেরকে—আমাদের মতো হাজারো পরিবারকে—প্রতিদিন চেপে ধরে। আমরা তাদের আশ্বস্ত করি, মিথ্যা বলি, গল্প বানাই। কখনও তারা বিশ্বাস করে, কখনও আমাদের চোখের দিকে তাকিয়ে টের পায়—কিছু ভ*য়ানক ঘটে যাচ্ছে।
গত মাসে, যু*দ্ধ*বিরতির অবসান ঘটল। আর তার পরেই যেন নেমে এলো এক নিরবচ্ছিন্ন নরকযাত্রা।
এখন, গাজা যেন এক অ*গ্নিকুণ্ড, যেখানে শিশু, নারী, বৃদ্ধ—কেউ নিরাপদ নয়।
মাত্র তিন সপ্তাহে নি*হত হয়েছে ১,৪০০-রও বেশি মানুষ।
বোমা, *ধ্বংস, আর্তনাদ—এখন এই শহরের নিত্যদিনের সঙ্গী।
আঘাত এসেছে আমাদের খুব কাছেও।
গতকালই ই*সরা*য়েলি সেনাবাহিনীর হামলায় গা*জা সিটির আল-নাখিল সড়কে নি*হত হয়েছেন ১১ জন, যাদের মধ্যে পাঁচজন শিশু।
তার আগে, দার আল-আরকাম স্কুলে, যেখানে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছিল, মুহূর্তেই মিশে গেল শ্রেণিকক্ষ ছাইয়ে। নি*হত অন্তত ৩০ জন—প্রায় সবাই নারী ও শিশু।
এই স্কুলটি আমার বাসা থেকে মাত্র ১০ মিনিট দূরে।
জাবালিয়া, ফাহদ স্কুল, UNRWA-র ক্লিনিক—একটির পর একটি জায়গা, যেগুলো নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করা হতো, সেগুলোতেই দেখা গেছে রক্ত, আগুন আর মৃ*ত্যুর বি*ভীষিকা।
এই পরিস্থিতির মাঝেই আসে এক নির্দেশ—
“অবিলম্বে সরে যান।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোথায় যাব?
উত্তর ধ্বং*সস্তূপ। দক্ষিণও নিরাপদ নয়।
সমুদ্র প্রাচীর, রাস্তাগুলো মৃত্যু ফাঁদ।
আমরা রয়ে যাই।
কারণ আমরা সাহসী—তা নয়।
আমাদের যাওয়ার কোথাও নেই।
আমরা যে আতঙ্ক অনুভব করি, তাকে ‘ভয়’ বলা যথেষ্ট নয়।
এই অনুভব এক চেপে বসা আতঙ্ক, যা বুকের ভেতর পাথরের মতো বসে থাকে, থমকে দেয় নিঃশ্বাস।
এটি সেই মুহূর্ত—যখন ক্ষে*প*ণাস্ত্রের শিস শোনা যায়, আর আপনি ভাবেন—এইবার বুঝি সব শেষ।
আমি একজন লেখক। একজন সাংবাদিক। মাসের পর মাস ধরে লিখে চলেছি, বিশ্বকে জানিয়ে চলেছি আমাদের বাস্তবতা। আমি জানি, অনেক সময় এসব লেখা এক গভীর শূন্যে হারিয়ে যায়।
তবুও লিখি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, কোথাও কেউ শুনছে। কেউ পড়ছে।
আমি লিখি, যাতে একদিন ইতিহাস লেখা হলে, কেউ না বলতে পারে—“আমরা জানতাম না।”
-Nour ElAssy
Is a poet and writer based in Gaza