07/12/2025
সুদীর্ঘ ২৭ বছর জেল খাটার সময় ,
নেলসন ম্যান্ডেলা সূর্য কি জিনিস চোখেই দেখেননি।
তারপর তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর একদিন তাঁর কয়েকজন অনুসারীদের বললেনঃ -"চলো আজ শহর দেখবো, চার দেয়ালে বন্দি থেকে জীবনের দীর্ঘ সময় কেটে গেলো, এতদিনে নিজের শহরটি কেমন হয়েছে, স্বচক্ষে না দেখলেই নয়।"
অনুসারীদের সাথে নিয়ে 'নেলসন ম্যান্ডেলা' শহরের অলি-গলিতে সাধারণ মানুষের মতো হাঁটলেন। হঠাৎ তাঁর খুব ক্ষিদে পেলো। সাথীদের বললেন:-'চলো , সামনের মোড়ে যদি কোনো রেস্তোরাঁ পাই, সেখানেই কিছু খেয়ে নিতে চাই।'
নেলসন ম্যান্ডেলার কথা শোনে সবাইতো অবাক!
একজন রাষ্ট্রনায়ক আহাড় করবেন পথের ধারে গড়ে ওঠা সামান্য হোটেলে! বিষয়টি ম্যান্ডেলা বুঝতে পারলেন, বললেন,"অবাক হওয়ার কিছু নেই, ক্ষিদে পেয়েছে, খাবো। জেলখানার বিভৎস খাবার খেয়েও যেহেতু বেঁচে আছি, তাই এতো সহজে মরবো না।"
শেষে তাই হলো, সবাই মিলে একটি সাধারণ হোটেলে প্রবেশ করে একটি টেবিলে খেতে বসেছেন।অল্পদূরে আরেকজন ভদ্রলোক বসে আছেন, বেশ বয়ষ্ক। স্বয়ং ম্যান্ডেলা হোটেলের ওয়েটারকে ডেকে বললেন, --"একটা চেয়ার এনে আমার পাশে রাখো এবং ওনাকে বলো, আমার টেবিলে বসে খেতে।"
ভদ্রলোকও আসলেন, এসে তাঁর পাশের চেয়ারটায় বসলেন। খেতে খেতে সবাই গল্প করছেন কিন্তু পাশে বসা ভদ্রলোক কিছুই খেতে পারছেন না। ওনার হাত কাঁপছে! চামচ থেকে খাবার প্লেটে পড়ে যাচ্ছে!ম্যান্ডেলার সহকর্মীদের একজন বললেন:--"আপনি বোধহয় বেশ অসুস্থ। ভদ্রলোক কোন উত্তর দিলেন না, নিরব রইলেন।
নেলসন ম্যান্ডেলা, নিজ হাতে ওনাকে খাবার খাইয়ে দিলেন এবং ওয়েটারকে ডেকে বললেন, ওনার খাবার বিলটা আমরা পরিশোধ করবো। খাবার শেষে সেই বয়স্ক ভদ্রলোক বিদায় নিতে উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু সবাই অবাক চোখে দেখলো, লোকটি ভালো করে দাঁড়াতে পারছেন না, দাঁড়াতে পারলেও হাঁটতে পারছেন না, শারীর কাঁপছে! নেলসন ম্যান্ডেলা নিজ হাতে ওনাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলেন এবং একজনকে বললেন:-- 'ওনাকে এগিয়ে দিয়ে আসো।'
অনুসারীদের মধ্যে আরেকজন বললেন , এতো অসুস্থ শরীর নিয়ে উনি বাড়ী পৌঁছাতে পারবেন তো ! এই সময় ম্যান্ডেলা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলতে শুরু করলেন: ---'আসলে উনি অসুস্থ না। বিষয়টি হচ্ছে,
আমি জেলের মধ্যে যেই সেলে বন্দি ছিলাম, উনি ছিলেন সেই সেলের গার্ড। আমার উপর অমানবিক নির্যাতনের পর আমার ভীষণরকম তৃষ্ণা পেতো।পিপাসায় কাতর আমি যতোবার পানি! পানি! বলে চিৎকার করেছি ততবারই উনি আমার সমস্ত শরীরে প্রসাব করে দিতেন। আজ আমি দেশের প্রেসিডেন্ট। দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী হওয়ার পর ওনাকে আমি আমার টেবিলে একসাথে খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করেছি ! তাই সেই সব দিনগুলোর কথা মনে করে উনি খুব ভয় পেয়েছেন।
কিন্তু ক্ষমতাবান হয়েই সাধারণ মানুষকে শাস্তি দেয়া তো আমার আদর্শের পরিপন্থী। এটা আমার নৈতিকতার অংশ নয়। তাই শাস্তির পরিবর্তে উনি ভালোবাসা পেয়েছেন। উনি আমার মুখে-শরীরে পেশাব করেছেন, আমি ওনার মুখে ভালোবেসে খাবার তুলে দিয়েছি।'
তিনি আরও বললেন,
মনে রাখবেন, আমি আপনাদের যেমন প্রেসিডেন্ট, তেমনই ওনারও প্রেসিডেন্ট। প্রতিটি নাগরিকের অধিকার, সম্মান এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিৎ করা আমার নৈতিক দায়িত্ব এবং কর্তব্য। শুধুমাত্র প্রতিশোধের মানসিকতা'ই একটি সাজানো-গোছানো রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দিতে পারে আর সহনশীলতার মানসিকতা একটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে।