30/06/2026
পথ (Path)
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর একটি গান ছোটবেলা থেকেই পছন্দ করে শুনতাম। একটা সহজ প্রশ্ন কিভাবে এতো বিষন্নতার সুর বহন করে সেই নিয়ে এতো ছোট আমি কেন কৌতুহল ছিলাম জানিনা। যখন থেকে বুঝা শিখলাম তারপর থেকে এই লাইন গুলো শুনলে মনে হতো আমাকেই বুঝি প্রশ্ন করছেন হেমন্ত তার স্বর্নকন্ঠে -
আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা
আর কতো কাল আমি
রবো দিশেহারা,
জবাব কিছুই তার দিতে পারি নাই শুধু
পথ খুঁজে কেটে গেল
এ জীবন সারা।।
স্কুলে থাকতে যে ৩৩ শতাংশ মানুষ “এইম ইন লাইফ” রচনায় ডাক্তার হয়ে গ্রামে ফ্রি চিকিৎসা দিতে চেয়েছিল, আমি তাদের মধ্যে একজন ছিলাম।
কলেজে ওঠার সময় সিদ্ধান্ত নিলাম—চাকরি করে অপরিচিত মানুষের চাকর হওয়া যাবে না। ব্যবসা করব, টাকা কামাব, বিয়ে করব, তারপর বউয়ের চাকর হব।
যেই কথা, সেই কাজ।
আম্মার দুইটা গালি খেয়ে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে এলাম।
কলেজ-ভার্সিটি মিলিয়ে প্রায় আট বছর পার হয়ে গেল।
এর মধ্যে অনেক কিছু শিখলাম। ডিগ্রি পেলাম। সার্টিফিকেট পেলাম। অতঃপর গ্র্যাজুয়েশনের মাসখানেক আগে এসে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা নিলাম।
আমি আসলে কী হতে চাই, সেটা না।আমি কেমন জীবন চাই, সেটা।
আমি ভালো থাকতে চাই। যে কাজ করে খুশি থাকব, সেই কাজই করতে চাই।শান্তির জীবন চাই।
ভাত একবেলা কম খেলেও সমস্যা নেই। কিন্তু এমন কাজ করতে চাই না, যেটা করতে গিয়ে প্রতিদিন সকালে উঠে নিজের জীবনটাকেই বোঝা মনে হয়। আমি যেখানেই থাকি না কেন, যা-ই করি না কেন, আমার মুখে যেন হাসি থাকে। আমি যেন জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটা ভাবনা খুব পরিষ্কার ছিল—শুধু ভালো লাগা দিয়ে ক্যারিয়ার হয় না। আবার শুধু টাকা দিয়েও হয় না।
আমার কাছে একটা ভালো পেশা চারটা জিনিসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রথমত, কাজটা আপনার ভালো লাগতে হবে। আমার রান্না করতে ভালো লাগে।
দ্বিতীয়ত, কাজটা এত ভালো ভাবে শিখতে হবে যেনো মানুষ বলে, “এই কাজের জন্য ওর মতো মানুষই লাগে।”
আমি ২০০৯ সাল থেকে রান্নাঘরে টুকটাক রান্না করতাম। সেই টুকটাক রান্না দিন দিন শুধু পরিসরে বেড়েছে। বাসায় মেহমানদের জন্য কাচ্চি বিরিয়ানি রান্না করা থেকে শুরু করে নিজের ক্লাউড কিচেন খুলে সারারাত চিকেন ফ্রাই ভেজেছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার দক্ষতার পরিধিও বেড়েছে।
তৃতীয়ত, এমন কিছু হতে হবে, যেটার মানুষের কাছে মূল্য আছে। মানুষ যেটার জন্য টাকা দিতে রাজি থাকে। মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাবার একটি। তাই একজন বাবুর্চির অবশ্যই মূল্য আছে।
আর শেষ জিনিসটা সবচেয়ে কঠিন।
-হার না মেনে লেগে থাকা।
এক-দুইবার ব্যর্থ হওয়া মানেই গল্পের শেষ নয়। সফলতার শিখরে পৌঁছাতে হলে ব্যর্থতার সিঁড়িতে পা রাখতেই হয়। ব্যর্থতার স্বাদ একবার না নিলে সাফল্যের স্বাদও অনেক সময় পানসে লাগে।
স্বপ্নের অভাবে যত মানুষ থেমে যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ থেমে যায় ধৈর্যের অভাবে।
পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও একা একটি ক্লাউড কিচেন চালিয়েছিলাম। একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তারপর সিদ্ধান্ত নিই, নতুন করে সময় নিয়ে আবার শুরু করব। এবার নিজেকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করব।
এই কারণেই বেছে নিয়েছি এই গোলাপী এপ্রনটা।
গোলাপী এপ্রনের একটা সিক্রেট আছে।
একটু পরেই সেটা জানতে পারবেন।
আপাতত গল্পে ফিরি।
অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল একটা শেফের কোর্স করার।
জীবনে অনেক সার্টিফিকেট অর্জন করেছি।
মনে হয়, এই একটাই সার্টিফিকেট হবে, যেটা আমি শুধু নিজের ভালো লাগার জন্য নেব।
রান্না করতে আমার কখনো খারাপ লাগে না।
অনেক ছোটবেলা থেকেই আম্মুর রান্না দেখতাম।
কোন মসলা কখন দিতে হয়, কোন জিনিসটা কতক্ষণ রান্না করলে স্বাদটা ঠিক আসে—এসব দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি।
তখন বুঝিনি, ভালো লাগার জিনিসগুলোর বীজ অনেক সময় ছোটবেলাতেই বপন হয়ে যায়।
বড় হয়ে শুধু সাহস করে তাতে পানি দিতে হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের সমাজে সেই সাহসটাকে খুব কমই জায়গা দেওয়া হয়।
একটা ছেলে বা মেয়ের বয়স আঠারো হলেই মনে হয়, সামনে মাত্র কয়েকটা রাস্তা খোলা- ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যবসায় শিক্ষা, কম্পিউটার বিজ্ঞান।
যেন পৃথিবীতে আর কোনো পেশাই নেই।
গবাদিপশুর খামারের মতো একেকটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ আর সিএসই ডিপার্টমেন্টে কত যে লেখক, গায়ক, অভিনেতা, চিত্রশিল্পী নিজেদের ইচ্ছার গলা চেপে বাবা-মায়ের কষ্টের টাকার মূল্য দিয়ে বেড়াচ্ছে! তারা হয়তো জীবনে অনেক বড় সফলতাও অর্জন করবে। কিন্তু দিন শেষে নিজের ক্যানভাস বা গিটারের দিকে তাকিয়ে অন্তত একবার আফসোস করবেই।
যে ছবি আঁকে, কাঠ দিয়ে কাজ করে, কাপড় বানায়, গাড়ি নিয়ে পড়ে থাকে, গান গায়, ভিডিও বানায়—সবাইকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়।
তারপর চার বছর পরে আমরা অবাক হয়ে বলি—"এত ছেলেমেয়ে চাকরি পাচ্ছে না কেন?”
চার বছর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে, তারপর এমবিএ করে, কোনো এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির অফিসের নিচে লাঞ্চ ব্রেকে সিগারেটে দুই টান দিয়ে নিজের জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
কারণ, আমরা সবাইকে একই দরজা দিয়ে ঢোকানোর চেষ্টা করছি।
আরেকটা জিনিস আমরা আরও মজার করি।
বাংলাদেশে কাউকে যদি বলেন, “আমি রাঁধুনি হব।”
অনেকে ভুরু কুঁচকাবে।
বলবেন, “এত পড়াশোনা করে এই কাজ?”
কিন্তু সেই একই মানুষ যখন বিদেশে যায়, তখন গর্ব করেই রান্না করে, ট্রাক চালায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে, গুদামে কাজ করে।
কারণ সেখানে কাজকে ছোট করা হয় না।
আমরা এখনো পেশার সম্মানটা বেতনের অঙ্ক দিয়ে মাপি।
এটাই বদলানো দরকার।
আমাদের সমাজে পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন।
আমি বাবা-মায়েদেরও একটা কথা বলতে চাই।
আপনার ছেলে বা মেয়ের স্বপ্নের সঙ্গে একমত না-ও হতে পারেন। কিন্তু একবার অন্তত জিজ্ঞেস করে দেখবেন—
“তুই এটা কেন করতে চাস?”
হয়তো উত্তরটা শুনে অবাক হবেন।
হয়তো যে ছেলেটাকে আপনি জোর করে একটা পথ প্রদর্শন করে দিচ্ছেন , হয়তোবা সে অন্য একটা পথেই উজ্জ্বল হতে পারবে—শুধু যদি আপনি তার পাশে দাঁড়ান।
কেউ একজন তোমার পাশে আছে—এই অনুভূতিটাই তোমাকে অনেক লম্বা একটি পথ পাড়ি দিতে মনোবল যোগাবে।
আমি জানি না এই গোলাপী এপ্রনটা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে।
ওহ! গোলাপী এপ্রন!
আমাকে এই গোলাপী এপ্রনটা আম্মুর দেয়া উপহার ।
আম্মার জীবনের অন্যতম বড় চাওয়া ছিল, আমি যেন একটা পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। নামের আগে বা পরে যেন একটা সম্মানজনক উপাধি থাকে।
আমি শেফ হতে চাই—এটা জানার পর প্রথমে তিনি একটু দ্বিধায় পড়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর বিশ্বাসের জোরে সব সময়ের মতোই আমার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আমি শেফ হলে হয়তো পিএইচডির মতো সামাজিক সম্মান পাব না। তবুও আমাকে খুশি দেখতে মা নিজের সেই স্বপ্নটাকে একপাশে সরিয়ে রেখেছেন।
মা, এই জীবনে যদি পারি, কালিনারি আর্টসেই পিএইচডি করে ফেলব। স্বপ্ন কারোরটাই বাদ দিবো না।
রান্নাবান্নায় ও যে পিএইচডি যে করা যায়, সেটা খুব সম্প্রতি জানতে পেরেছি।
আমার গন্তব্য হয়তো অনেক দূর। আবার হয়তোবা খুব বেশি দূরও নয়।
কিন্তু আমার মুখের হাসিটা এমনই থাকবে।সে পথ যত দূরেই হোক।
কিন্তু অনেকদিন পর মনে হচ্ছে, আমি আর অন্য কারও স্বপ্ন পূরণ করার চেষ্টা করছি না।
আমি নিজের স্বপ্নটার দিকেই হাঁটছি।
শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছাব, জানি না।
কিছুই না হতে পারলে তাতেও আফসোস থাকবে না।
কারণ আমার গল্পে ব্যর্থতা থাকলেও, এটা আমার নিজের গল্প হবে।
জীবনে এমন একটা বয়স আসে, যখন মানুষ বুঝতে পারে—সবচেয়ে দামি জিনিসটা টাকা নয়।
শান্তি।
আর আমি সেই শান্তির পেছনেই দৌড়ানো শুরু করেছি।
দোয়া করবেন, যেন দৌড়টা শেষ পর্যন্ত থেমে না যায়।
আপনাকেও শুভকামনা।
লিখতে মন চাইলে লিখুন।
নাচতে মন চাইলে নাচুন।
বডি বিল্ডিং করতে ভালো লাগলে করুন।
মাছ ধরতে মন চাইলে মাছ ধরুন।
চা বেচতে মন চাইলে তাও বেচুন। এলাচ আর জাফরান দিয়ে নবাবী দুধ চা বানিয়ে বেচুন।
অথবা ইন্টারন্যাশনাল ট্যুর গাইড হয়ে যান।
আপনার কি ভাল্লাগবে সেটা আমিই বা কিভাবে বলবো, অন্য কেউই বা কিভাবে বলবে। পঞ্চ ইন্দ্রিয়র পরে যে ইন্দ্রিয় তাকে পথ প্রদর্শন করতে দিন। আপনার কি ভালো লাগে তা শুধু আপনি নিজে নির্ধারণ করতে পারবেন ।
জীবন একটাই।
এক্সপ্লোর করুন।
নিজেকে খুঁজে পাবেন—এই আশা করি।
আফসোসের ওজন অনেক সময় ব্যর্থতার চেয়েও বেশি হয়।