11/12/2023
নটর ডেম কলেজের অধ্যাপক লিওনার্ড শেখর গোমেজ
না, স্যার এখন নটর ডেম কলেজে নেই, তিনি ছিলেন, আমাদের সময়ে ছিলেন। ১৯৯১-৯৩ কলেজে পড়ার সময় স্যারকে দুই একবার দেখেছিলাম। ইংরেজী বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন। আমাদের ইংরেজী অধ্যাপক ছিলেন জাহাঙ্গীর স্যার, তবে মাঝে মাঝে নটর ডেম কলেজের বাঘ টেরেন্স পিনেরু স্যার পড়াতেন। কিন্তু শেখর স্যারকে আমরা পাইনি।
খুব ছোটবেলা থেকেই সাপ্তাহিক প্রতিবেশীর একনিষ্ঠ পাঠক এবং এক পর্যায়ে নিয়মিত লেখা-লেখি করার সুবাদে বাণীদীপ্তি গানের সব ধরণের ধর্মীয় গানের ক্যাসেট ছিল আমাদের ঘরে। তখন বড়দিন কিংবা পাস্কা পার্বণে জনপ্রিয় কিছু গান ঘরে ঘরে বাজাতে শুনেছি। স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে তুমি,শোন শোন শোন, আজি ফুলে ফুলে যায় দুলে দুলে, আজি এলো সে বড়দিন, হে বাণী স্বর্গীয়, কাঁপায়ে ঘন ঘিরি, হবে তার আগমন কিংবা ইস্টারের কবরে নাই রে যীশু, ঘন গোর গম্ভীর, জয়ধনী হোক রে আজি সব কালজয়ী গান। তখনকার গান মানেই শেখর স্যার, কমল রড্রিক্স, স্নেহা রোজারিও, আলফন্স পঙ্কজ, অপু গাঙ্গুলি'র মত গুণী শিল্পীদের কণ্ঠে গান। তাদের কণ্ঠ ও সেই কালজয়ী গান কখনো মুছে যাবে না কিংবা এমন গান কেউ সৃষ্টি করতে পারবে কিনা সন্দেহ! 'স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে তুমি' কালজয়ী গানের কথা ও সুর করেছেন আরেক গুণী মানুষ পিটার সরকার। এবং কণ্ঠে তুলেছেন আমাদের অধ্যাপক শেখর স্যার। অসাধারণ কণ্ঠের জাদুকর স্যারের এই গান চির অম্লান হয়ে আমাদের মাঝে রয়ে যাবে।
তখন থেকেই পরিচিত ছিলাম স্যারের কণ্ঠের সাথে। যখন নটর ডেম কলেজে ভর্তি হলাম কলেজের বার্ষিক ম্যাগাজিনে দেখলাম শেখর স্যার ইংরেজি পড়ান। দুই বছরে স্যারকে দেখেছি দুইবার। এর পর আর দেখা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মধ্যম ব্যবহার করি ২০০৮ থেকে। ধীরে ধীরেবাড়তে থাকে বন্ধুর তালিকা। সমাজের গুণীজন, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, গায়ক অনেকের তালিকায় যুক্ত হয়েছি, সেই সুবাদে শেখর স্যারের তালিকাও যুক্ত হলাম। স্যার মাঝে মাঝে মন্তব্যের তালিকায় মনের ভাব প্রকাশ কিংবা প্রশ্ন করতেন।
গতকাল পল ফিলিপ রোজারিও দাদার বাসায় স্যারের সাথে দেখা, কথা বলা এবং গান শোনা। দেখা হবে ছবি তুলবো না তা কি হয়? স্যার উপস্থিত সবাইকে মুগধ করলেন, জয় করে নিলেন সবার মন। স্যারের গান এর চেয়ে বেশি কিছু বলার যোগ্যতা আমার নেই।
অবসর জীবনে আছেন স্যার। জীবনে শিক্ষায়জ্ঞানের আলো এবং সাংস্কৃতি অঙ্গনে দিয়ে গেছেন নিঃস্বার্থ ভাবে। আমরা কি স্যারের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পেরেছি?
স্যার সম্পর্কে ডাক্তার নেভেল ডি'রোজারিও ফেসবুকে লিখেছেন-"লিওনার্ড শেখর গমেজ বাংলাদেশ তথা খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের একজন পরিচিত কন্ঠশিল্পী। গতকাল সন্ধ্যায় লিওনার্ড শেখর গমেজ গানের প্রতি তার ভালোবাসা বংশগত, নয় বছর বয়স থেকে তিনি তবলায় তালিম নেয়া শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে ঢাকার সেন্ট জোসেফ হাই স্কুল থেকে সিনিয়র কেমব্রিজ স্নাতক হওয়ার পর তিনি তবলা বাজানো থেকে গানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রশিক্ষক পিসি গমেজের নির্দেশনায় তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেয়া শুরু করেন। ১৯৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পি হিসেবে তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। ১৯৮৩ সালে রোমে অনুষ্ঠিত 'দ্য ক্যাথলিক মিউজিক ফেস্টিভ্যাল'-এ অংশগ্রহন করে সারা বিশ্বের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে পোপ জন পল এর কাছ থেকে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে "নাগ নাগিনির প্রেম" ছায়াছবিতে বাংলাদেশের দুইজন বিখ্যাত শিল্পীঃ সাবিনা ইয়াসমিন ও এন্ডেরু কিশোরের সঙ্গে একটি ত্রয়ী কণ্ঠে গান প্লে ব্যাক করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ইংরেজীর (অনার্স) স্নাতক ও মাষ্টার ডিগ্রীধারী ১৯৯৪ সালে, স্ত্রী শুভ্রা টুলু, মেয়ে শাওন ও ছেলে স্বপ্নিলকে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে অভিবাসন গ্রহণ করেন। পেশাগত জীবনের বেশির ভাগ সময় শেখর গমেজ শিক্ষকতা করেছেন বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ১৯৮১ সালে তিনি নটরডেম কলেজে অধ্যাপনা শুরু করে নিউজিল্যান্ডে অভিবাসনের আগ পর্যন্ত একজন সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে নিউজিল্যান্ডে তিনি ডিপ্লোমা অফ টিচিং কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করে Sir Edmund Collegiate এ শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০৫-০৮ পর্যন্ত সৌদি আরবের Jubail University তে Associate Professor এর দায়িত্ব পালন করেছেন। তারপর ২০০৯ থেকে ২০১৫ অব্দি সৌদি আরবের জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ২০১৬ সালে NZ-এ ফিরে আসেন এবং অকল্যান্ড ইনস্টিটিউট অফ স্টাডিজে ইংরেজি ভাষা এবং সাহিত্য এ কয়েক বছর ধরে শিক্ষকতা করে ২০২১ সালে অবসর গ্রহন করেন।"
স্যারের শিক্ষা ও কালজয়ী গান উপহার আমাদের আশীর্বাদ হয়ে থাকবে আজীবন।
সুস্থ ও ভালো থাকবেন স্যার।