06/06/2026
বিবাহিত জীবনের প্রায় দুই বছর। তারা একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। মেয়ের পরিবার বিয়েটি মেনে নিলেও ছেলের পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি। ছেলেটি ঢাকায় একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করত। বিয়ের পর তারা ঢাকায় একটি ভাড়া বাসায় সংসার শুরু করে। পরিবারের অমতের কারণে ছেলেটি ধীরে ধীরে নিজের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও কমিয়ে দেয়।
সংসার জীবনের ছয় মাস পর একদিন ছেলেটির বাড়ি থেকে ফোন আসে—তার মা অসুস্থ। খবর পেয়ে সে তৎক্ষণাৎ গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। কিন্তু যাওয়ার পরদিন থেকেই তার ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। স্ত্রী কোনোভাবেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ কেটে যায়।
অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি শ্বশুরবাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, তার স্বামী নাকি বাড়িতেই আসেননি। হতাশ হয়ে ফিরে আসার সময় এলাকার এক ব্যক্তি তাকে জানান যে তার স্বামী হাসপাতালে ভর্তি আছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তিনি হাসপাতালে পৌঁছে যা দেখলেন, তা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক।
তার স্বামী পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। দেখাশোনার মতো পাশে কেউ ছিল না। তার একটি হাত এবং একটি পা ভেঙে গিয়েছিল। পরে জানা যায়, পরিবারের অমতে বিয়ে করার কারণে বাড়িতে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরাই তাকে নির্মমভাবে মারধর করেছিল। আহত অবস্থায় হাসপাতালে রেখে তার পরিবারের লোকজন চলে যায়।
স্বামীর এমন অবস্থা দেখে স্ত্রী ভেঙে পড়লেও হাল ছাড়েননি। তিনি হাসপাতালের বকেয়া বিল পরিশোধ করে স্বামীকে ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করান। আমরাও সাধ্যমতো সর্বাত্মক সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। সেখানে দীর্ঘ এক মাস চিকিৎসার পর চিকিৎসকেরা তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
বাসায় ফেরার পর শুরু হয় আরও কঠিন সংগ্রাম। একদিকে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা, অন্যদিকে সংসারের খরচ—সবকিছু সামলাতে তিনি হিমশিম খেতে থাকেন। স্বামীকে বাসায় রেখে চাকরির খোঁজ শুরু করেন। পরে আমরা তাকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে সক্ষম হই।
বিভিন্ন সময় আমরা তাকে আর্থিক সহায়তা দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। স্বামীর সেবা, চাকরি এবং সংসারের দায়িত্ব—সবকিছু একাই কাঁধে তুলে নেন তিনি। এই দীর্ঘ সংগ্রামের সময় নিজের বাবার বাড়ি থেকেও কোনো ধরনের সাহায্য নেননি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্বামীর এত কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য তাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবেননি। কখনো তাকে নিরাশ করেননি। নিজের জমানো টাকা, গয়না এবং মূল্যবান যা কিছু ছিল, সবকিছু বিক্রি করে স্বামীর চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করেছেন।
দীর্ঘ ১১ মাস চিকিৎসার পর ভদ্রলোক ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। আমরা খুব কাছ থেকে পুরো ঘটনাটি দেখেছি। একজন স্ত্রী কতটা দায়িত্বশীল, ধৈর্যশীল এবং আত্মত্যাগী হতে পারেন, তা এই ভদ্রমহিলাকে না দেখলে হয়তো কোনোদিন উপলব্ধি করতে পারতাম না।
তাদের কঠিন সময়জুড়ে আমরা পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, ভদ্রলোক এখন নতুন একটি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। আশা করি, ভদ্রমহিলার একার সংগ্রামের দিনগুলো এখন শেষ হয়েছে।
সামনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও সুন্দর, শান্তিময় ও সুখের সময়। ভালোবাসা এমনই থাকুক—বিশ্বাস, ত্যাগ, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার শক্তিতে বেঁচে থাকুক।
আল্লাহ তাদের জীবন সুখময়, সমৃদ্ধ ও আনন্দময় করুন। আমিন।